সুপার টাইফুন রাগাসা, এ বছরের বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়, হংকং এবং দক্ষিণ চীনের দিকে অগ্রসর হওয়ায় বুধবার এই অঞ্চলগুলো উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে। প্রচণ্ড বাতাস এবং ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে চীনের কর্তৃপক্ষ কমপক্ষে ১০টি শহরে স্কুল এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। এদিকে, তাইওয়ান এবং ফিলিপাইনে ঝড়টি ইতিমধ্যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং মৃত্যুর কারণ হয়েছে।
চীনে প্রভাব ও প্রস্তুতি
চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় অর্থনৈতিক কেন্দ্র গুয়াংডং প্রদেশে প্রায় ১৯ লাখ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা পূর্বাভাস দিয়েছে যে টাইফুনটি ইয়াংজিয়াং এবং ঝানজিয়াং শহরের মাঝামাঝি এলাকায় বুধবার সন্ধ্যায় আঘাত হানতে পারে। প্রায় এক ডজন শহরে স্কুল, কারখানা এবং গণপরিবহন বন্ধ রাখা হয়েছে।
তাইওয়ানে ধ্বংসলীলা
তাইওয়ানে একটি বাঁধ ভেঙে যাওয়ার কারণে সৃষ্ট বন্যায় কমপক্ষে ১৪ জন নিহত এবং ১২৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। টাইফুন রাগাসা দ্বীপটিতে প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে এসেছে। তাইওয়ানের প্রধানমন্ত্রী চো জুং-তাই বুধবার পূর্বাঞ্চলের একটি কাউন্টিতে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশে কী ভুল হয়েছে তা তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ১২৯ জন নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করাই এখন প্রধান অগ্রাধিকার।
ফিলিপাইনে ক্ষয়ক্ষতি
ফিলিপাইনের উত্তরাঞ্চলে টাইফুন রাগাসা গাছ উপড়ে ফেলেছে, ভবনের ছাদ উড়িয়ে দিয়েছে এবং কমপক্ষে ১০ জনের মৃত্যু ঘটিয়েছে। এর মধ্যে সাতজন মৎস্যজীবী সোমবার কাগায়ান প্রদেশের সান্তা আনা শহরের কাছে বিশাল ঢেউ এবং প্রচণ্ড বাতাসে নৌকা ডুবে গিয়ে মারা গেছেন। পাঁচজন মৎস্যজীবী এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। লুজনের উত্তরাঞ্চলে প্রায় ৭ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যার মধ্যে ২৫,০০০ মানুষ সরকারি জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন।
হংকং ও ম্যাকাওতে পরিস্থিতি
হংকং এবং কাছাকাছি ক্যাসিনো কেন্দ্র ম্যাকাওতে স্কুল এবং ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে, এবং অনেক দোকান বন্ধ রয়েছে। উভয় শহরে শত শত মানুষ অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। ম্যাকাওয়ের রাস্তাগুলো পানিতে ভেসে যাওয়া ধ্বংসাবশেষে ভরা স্রোতে পরিণত হয়েছে। হংকংয়ের লেই ইউ মুন এলাকায় দমকলকর্মীরা বন্যার পানিতে হেঁটে বেড়াচ্ছেন।
হংকং, বিশ্বের ব্যস্ততম কার্গো বিমানবন্দর এবং আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহনে নবম ব্যস্ততম বিমানবন্দর, মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে ৩৬ ঘণ্টার জন্য সকল ফ্লাইট বাতিল করেছে। ফ্লাইটরাডার২৪ ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী, হংকংয়ের চারটি প্রধান এয়ারলাইন্সের প্রায় ৮০% উড়োজাহাজ জাপান, চীন, কম্বোডিয়া, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া এবং অন্যান্য স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বা গ্রাউন্ড করা হয়েছে।
হংকংয়ের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার জানিয়েছে, টাইফুন রাগাসার কেন্দ্রের কাছে সর্বোচ্চ বাতাসের গতি প্রায় ১৯৫ কিমি/ঘণ্টা (১২০ মাইল/ঘণ্টা), এবং এটি আর্থিক কেন্দ্রের প্রায় ১০০ কিলোমিটার (৬২ মাইল) দক্ষিণে অবস্থান করছে। ঝড়টি পশ্চিম বা পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে প্রায় ২২ কিমি/ঘণ্টা (১৪ মাইল/ঘণ্টা) গতিতে অগ্রসর হচ্ছে।
সরকার জানিয়েছে, পানির স্তর ২০১৮ সালের টাইফুন মাংখুতের সময়ের মতো হতে পারে, যা হংকংয়ে প্রায় ৪৬০ কোটি হংকং ডলার (৫৯২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) মূল্যের অর্থনৈতিক ক্ষতি করেছিল।
প্রস্তুতি ও সতর্কতা
প্রভাবিত অঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য নিম্নলিখিত সতর্কতা এবং প্রস্তুতির পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে:
- জরুরি সরবরাহ যেমন খাদ্য, পানি, ওষুধ এবং ব্যাটারি সংগ্রহ করুন।
- স্থানীয় আবহাওয়া পূর্বাভাস নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করুন।
- নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
- জানালা-দরজা সুরক্ষিত করুন এবং বাইরের জিনিসপত্র নিরাপদ স্থানে রাখুন।
সুপার টাইফুন রাগাসা হংকং, দক্ষিণ চীন, তাইওয়ান এবং ফিলিপাইনের জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঝড়ের কারণে ইতিমধ্যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং মৃত্যু হয়েছে, এবং প্রভাবিত অঞ্চলগুলোতে আরও ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। সর্বশেষ তথ্যের জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং আবহাওয়া সংস্থার আপডেটগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করুন।


