হামাস গ্রহণ করেছে ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা: গাজায় দুই বছরের যুদ্ধের অবসান

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০-দফা শান্তি পরিকল্পনা গ্রহণ করে হামাস গাজায় চলমান দুই বছরের যুদ্ধের অবসান ঘোষণা করেছে। এই চুক্তির ফলে ইসরায়েল থেকে সকল জিম্মির মুক্তি এবং ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর গাজা থেকে প্রত্যাহারের পথ প্রশস্ত হয়েছে। মধ্যস্থতাকারী কাতার, মিশর এবং তুরস্কের সহায়তায় এই ঐতিহাসিক চুক্তি সম্ভব হয়েছে বলে ট্রাম্প জানিয়েছেন।

ট্রাম্প মঙ্গলবার তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করে বলেন, “আমি গর্বিতভাবে ঘোষণা করছি যে ইসরায়েল এবং হামাস উভয়ই আমাদের শান্তি পরিকল্পনার প্রথম পর্যায়ে স্বাক্ষর করেছে। এর ফলে সকল জিম্মি খুব শীঘ্রই মুক্ত হবে এবং ইসরায়েল তাদের সেনাবাহিনী একটি সম্মতিপ্রাপ্ত রেখায় প্রত্যাহার করবে। এটি আরব ও মুসলিম বিশ্ব, ইসরায়েল, আশেপাশের দেশগুলো এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি মহান দিন। শান্তিপ্রিয়রা ধন্য!”

শান্তি পরিকল্পনার মূল দিকসমূহ

ট্রাম্পের এই ২০-দফা পরিকল্পনায় গাজার পুনর্নির্মাণ, মানবিক সাহায্য বৃদ্ধি এবং হামাসের সম্পূর্ণ অস্ত্রত্যাগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাজা থেকে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করবে বিনিময়ে হামাসের কাছে আটক ৪৮ জন জিম্মির মুক্তি। হামাসের মতে, এর মধ্যে ২১ জন জীবিত আছেন। চুক্তি স্বাক্ষরের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সকল জিম্মির মুক্তি হওয়ার কথা ছিল, যদিও হামাস সাম্প্রতিককালে জানিয়েছে যে কিছু মৃত জিম্মির দেহ ধ্বংসাবশেষের নিচে দাফনিত হতে পারে।

পরিকল্পনায় হামাসের যারা স্বেচ্ছায় অস্ত্রত্যাগ করবে তাদের ক্ষমা প্রদান করা হবে। গাজার অস্থায়ী প্রশাসনের দায়িত্ব পালন করবে একটি নিরপেক্ষ প্যালেস্টাইনীয় কমিটি, যা জনসেবা ও পৌরসভার দৈনন্দিন কাজ দেখবে। ট্রাম্প এবং সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক ‘শান্তি বোর্ড’ গাজার পুনর্নির্মাণ তত্ত্বাবধান করবে। এছাড়া, মধ্যপ্রাচ্যের বিশেষজ্ঞদের একটি প্যানেল অর্থনৈতিক পুনর্নির্মাণ পরিকল্পনা তৈরি করবে। পরিকল্পনায় গাজা দখল বা জোরপূর্বক স্থানান্তরের কোনো বিধান নেই।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু গত সপ্তাহে এই পরিকল্পনায় সম্মতি দিয়েছিলেন। ট্রাম্প জানিয়েছেন, নেতানিয়াহু কাতারি নেতার সাথে ‘হৃদয়-থেকে-হৃদয়’ কথোপকথনে গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলার জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন। চুক্তির ফলে ইসরায়েল ২৫০ জীবনাদায়কারী শাস্তিপ্রাপ্ত বন্দী এবং ১৭০০ গাজানি বন্দী মুক্তি দেবে।

গাজা যুদ্ধের পটভূমি

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলে হামলা দিয়ে এই যুদ্ধ শুরু হয়, যা হলোকস্টের পর ইহুদিদের জন্য সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দিন হিসেবে চিহ্নিত। এতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয় এবং গাজায় মানবিক সংকট দেখা দেয়। গত দুই বছর ধরে চলা এই সংঘর্ষে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান এবং হামলা অব্যাহত ছিল। ২০২৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি গাজার দেইর আল-বালাহয় তিন জন ইসরায়েলি জিম্মির মুক্তির ঘটনা ঘটে, যা লোহিতক্রস দলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।

২০২৫ সালের ২৬ জুলাই তেল আভিভে মার্কিন দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভকারীরা যুদ্ধবিরতি, জিম্মি মুক্তি এবং নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। হামাস সাম্প্রতিককালে অস্ত্রত্যাগ এবং ইসরায়েলের পুনরায় আক্রমণের ভয় প্রকাশ করেছিল।

প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ

মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলো এই পরিকল্পনার সমর্থন করেছে। কাতার, মিশর এবং তুরস্কের মধ্যস্থতায় গত মাসে হামাসের কাছে পরিকল্পনা উপস্থাপিত হয়। ট্রাম্প বলেছেন, “আমরা মানুষদের থাকতে উৎসাহিত করব এবং তাদের গাজাকে আরও ভালো করে গড়ার সুযোগ দেব।” যদি হামাস চুক্তি না করত, তাহলে ইসরায়েলকে গাজায় তাদের অভিযান চালানোর জন্য পুরোপুরি সমর্থন দেওয়া হতো বলেও তিনি সতর্ক করেছিলেন।

এই চুক্তি প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র গঠনের সরাসরি পথ তৈরি না করলেও, জাতিসংঘের ১৫৭ সদস্য দেশ প্যালেস্টাইনীয় রাষ্ট্রত্বের সমর্থক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির একটি মাইলফলক হতে পারে।

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.