হিন্দুত্ব ও জনকল্যাণের সংমিশ্রণ: আসামের আসন্ন নির্বাচনে বিজেপি একটি দ্বিমুখী কৌশল গ্রহণ করেছে, যাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ‘হিন্দুত্ব এবং জনকল্যাণবাদের ককটেল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সরকার একদিকে যেমন হিন্দু জাতীয়তাবাদী আদর্শকে কঠোরভাবে প্রচার করছে, অন্যদিকে নারীদের কেন্দ্র করে বিভিন্ন আর্থিক অনুদান ও উন্নয়নমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে জনসমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালাচ্ছে। এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো ধর্মীয় মেরুকরণ বজায় রেখে ভোটারদের মধ্যে ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতাবোধ তৈরি করা।
২. নারীদের জন্য আর্থিক সুবিধা ও ‘অরুণোদয়’ প্রকল্প: বিজেপির প্রচারণার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো ‘অরুণোদয়’ (Orunodoi) প্রকল্প। এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৪০ লাখ নারীকে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি বিহু উৎসব উপলক্ষে দেওয়া বোনাসসহ এককালীন বড় অঙ্কের অর্থ বিতরণ করা হয়েছে, যা নারী ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। অনেক নারী ভোটার আল জাজিরাকে জানিয়েছেন যে, এই আর্থিক সহায়তা তাদের জীবনযাত্রায় মর্যাদা ফিরিয়ে এনেছে এবং এর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তারা বিজেপিকেই ভোট দেবেন।
মুসলিম বিরোধী কঠোর অবস্থান ও ‘মিয়া’ ইস্যু: নির্বাচনী প্রচারণায় বিজেপি নেতা ও মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বাংলাভাষী মুসলিমদের (যাদের স্থানীয়ভাবে ‘মিয়া’ বলা হয়) লক্ষ্য করে কঠোর বার্তা দিচ্ছেন। তাদেরকে অনেক ক্ষেত্রে ‘বিদেশি’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করে উচ্ছেদ অভিযান এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিজেপির প্রচারণায় সরাসরি বলা হচ্ছে যে, তারা আসামের ডেমোগ্রাফি বা জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন রোধ করতে এবং হিন্দুদের পরিচয় রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর।
উচ্ছেদ অভিযান ও ভূমি অধিকার: বিগত কয়েক বছরে আসাম সরকার কয়েক হাজার হেক্টর সরকারি জমি থেকে কথিত ‘অচেনা মানুষদের’ (বাংলাভাষী মুসলিমদের প্রতি ইঙ্গিত) উচ্ছেদ করেছে। বিজেপি এই কার্যক্রমকে আসামের আদিবাসী ও উপজাতিদের ভূমি অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার একটি ‘যুদ্ধ’ হিসেবে তুলে ধরছে। বুলডোজার দিয়ে বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়ার এই নীতিটি একদিকে যেমন হিন্দু ভোটারদের সন্তুষ্ট করছে, অন্যদিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
মুসলিম সম্প্রদায়ের আতঙ্ক ও অস্তিত্বের লড়াই: সরকারের এই কঠোর অবস্থানে আসামের প্রায় ৯০ লাখ বাংলাভাষী মুসলিম চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অনেক ভুক্তভোগী পরিবার জানিয়েছেন যে, তারা যুগ যুগ ধরে ভারতে বসবাস করলেও এখন তাদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। ১৯৮৩ সালের নেলি হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি স্মরণ করে অনেকেই বলছেন যে, তারা শুধুমাত্র নিজেদের ‘বিদেশি’ নয় বরং ‘ভারতীয় নাগরিক’ প্রমাণ করার তাগিদে এবং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে টিকে থাকতে এখন চরম অনিশ্চয়তার সম্মুখীন।বিরোধী পক্ষ ও সমালোচকদের মত: বিরোধী দলগুলো এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে নগদ অর্থ বিতরণ করা এক ধরণের ‘ভোট কেনা’র শামিল। তারা অভিযোগ করেছেন যে, বিজেপি সরকার মানুষের অভাবকে পুঁজি করে একটি ‘দাতা-গ্রহীতা’ সম্পর্ক তৈরি করেছে। এছাড়া ইউনিফর্ম সিভিল কোড (UCC) বাস্তবায়ন এবং ‘লাভ জিহাদ’ বিরোধী কঠোর আইনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিজেপি ধর্মীয় বিভাজনকে আরও উসকে দিচ্ছে বলে সমালোচকরা মন্তব্য করেছেন।



