হলিউডের সোনালি যুগের অন্যতম আইকন, অভিনেতা, পরিচালক এবং সানড্যান্স ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের প্রতিষ্ঠাতা রবার্ট রেডফোর্ড মঙ্গলবার (১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫) তার প্রিয় ইউটার সানড্যান্সের বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। তাঁর পাব্লিসিস্ট সিন্ডি বার্জার জানিয়েছেন, রেডফোর্ড তাঁর প্রিয়জনদের ঘিরে শান্তিপূর্ণভাবে ঘুমের মধ্যে মারা যান। কোনো নির্দিষ্ট মৃত্যুর কারণ ঘোষণা করা হয়নি, তবে এটি স্বাভাবিক মৃত্যুর মতোই বলে মনে হচ্ছে। এই খবরে হলিউড এবং সারা বিশ্বের সিনেমাপ্রেমীরা শোকাহত।
মৃত্যুর ঘটনা: শান্তিপূর্ণ বিদায়
রবার্ট রেডফোর্ড, যাঁর পুরো নাম চার্লস রবার্ট রেডফোর্ড জুনিয়র, তাঁর ইউটার সানড্যান্স রিজর্টের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। এই জায়গাটি তাঁর জীবনের একটি অংশ ছিল—যেখানে তিনি সানড্যান্স ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মের জগতে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। পাব্লিসিস্ট বার্জার বলেছেন, “রবার্ট রেডফোর্ড ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ তার সানড্যান্সের বাড়িতে মারা যান—যে জায়গাটি তিনি ভালোবাসতেন, তাঁর প্রিয়জনদের ঘিরে। তাঁকে খুব মিস করা হবে। পরিবার গোপনীয়তা চায়।” নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রথম রিপোর্ট অনুসারে, তিনি সকালে তার প্রোভোর কাছাকাছি বাড়িতে মারা যান।
তাঁর মৃত্যুতে কোনো দুর্ঘটনা বা অসুস্থতার কথা উল্লেখ করা হয়নি। বয়সজনিত কারণে এটি ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রেডফোর্ডের জীবন ছিল দীর্ঘ এবং সমৃদ্ধ, কিন্তু তাঁর পরিবারও দুঃখের ছায়ায় ঢাকা: তাঁর প্রথম স্ত্রী লোলা ভ্যান ওয়াগেনেনের সাথে চার সন্তানের মধ্যে দুজন ছেলে—স্কট অ্যান্থনি (১৯৫৯ সালে শৈশবকালীন মৃত্যু) এবং ডেভিড জেমস রেডফোর্ড (২০২০ সালে ক্যান্সারে মৃত্যু)—আগেই চলে গিয়েছিলেন। বেঁচে আছেন মেয়েরা শাউনা জিন রেডফোর্ড এবং এমি হার্ট রেডফোর্ড, এবং দ্বিতীয় স্ত্রী সিবিল সজাগার্স।
হলিউডের শোক: তারকাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি
রেডফোর্ডের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই হলিউডের তারকারা শোক প্রকাশ করেছেন। লিওনার্ডো ডিক্যাপ্রিও টুইটারে (এক্স) লিখেছেন, “একজন কিংবদন্তি হারিয়েছি। রবার্ট রেডফোর্ড আমার জীবনের অনুপ্রেরণা ছিলেন।” স্টিফেন কিং বলেছেন, “হলিউডের একটি যুগ শেষ হয়ে গেল।” ডোনাল্ড ট্রাম্পও শোক জানিয়েছেন, যদিও রাজনৈতিক পার্থক্য সত্ত্বেও। বারবরা স্ট্রাইস্যান্ড, যিনি ‘দ্য ওয়ে উই ওয়্যার’-এ রেডফোর্ডের সাথে অভিনয় করেছিলেন, ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন, “আমার প্রিয় সহ-অভিনেতা চলে গেলেন।” রন হাওয়ার্ড বলেছেন, “রবার্ট স্বাধীন ফিল্মের আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করেছিলেন।” মেরিল স্ট্রিপ এবং জেন ফন্ডাও শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
রবার্ট রেডফোর্ডের জীবন: সোনালি যুগের তারকা
রবার্ট রেডফোর্ড ১৮ আগস্ট, ১৯৩৬ সালে ক্যালিফর্নিয়ার সান্তা মনিকায় জন্মগ্রহণ করেন। কলোরাডো ইউনিভার্সিটি থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর তিনি অভিনয় শিখতে নিউইয়র্কের আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ ড্রাম্যাটিক আর্টসে ভর্তি হন। ১৯৬০-এর দশকে ব্রডওয়েতে অভিষেক করে তিনি হলিউডে প্রবেশ করেন।
তাঁর ক্যারিয়ারের সোনালি সময় ছিল ১৯৬০-৭০-এর দশক। পল নিউম্যানের সাথে ‘বাচ ক্যাসিডি অ্যান্ড দ্য সানড্যান্স কিড’ (১৯৬৯) তাঁকে রাতারাতি তারকা বানায়, যা বক্স অফিসে বিশাল সাফল্য ছিল। এরপর ‘দ্য স্টিং’ (১৯৭৩), ‘দ্য ওয়ে উই ওয়্যার’ (১৯৭৩), ‘অল দ্য প্রেসিডেন্টস মেন’ (১৯৭৬) এবং ‘আউট অফ আফ্রিকা’ (১৯৮৫)-এর মতো ফিল্মে তাঁর চ্যারিসম্যাটিক অভিনয় দর্শককে মুগ্ধ করেছিল। তাঁর নীল চোখ, সোনালি চুল এবং সূক্ষ্ম অভিনয় তাঁকে ‘হলিউডের গোল্ডেন বয়’ বানায়।
পরিচালক হিসেবে তাঁর প্রথম ফিল্ম ‘অর্ডিনারি পিপল’ (১৯৮০) সেরা ছবির জন্য অস্কার জিতে। তিনি মোট দুটি অস্কার, একটি বাফটা এবং পাঁচটি গোল্ডেন গ্লোব পান। ২০০২ সালে সম্মানসূচক অস্কার এবং ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্সিয়াল মেডাল অফ ফ্রিডম পান।
সানড্যান্স ইনস্টিটিউট (১৯৮১) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মকে প্রমোট করেন। এটি কুয়েনটিন ট্যারানটিনো, স্টিভেন সোডারবার্গের মতো পরিচালকদের জন্ম দেয়। পরিবেশবাদী হিসেবে তিনি ন্যাচারাল রিসোর্সেস ডিফেন্স কাউন্সিলের ট্রাস্টি ছিলেন এবং কীস্টোন এক্সএল পাইপলাইনের বিরোধিতা করেছিলেন।
তাঁর শেষ ফিল্মগুলোর মধ্যে ‘অ্যা ওয়াক ইন দ্য উডস’ (২০১৫) উল্লেখযোগ্য, যা বিল ব্রাইসনের বই অবলম্বনে তৈরি। রেডফোর্ড লিবারেল রাজনীতির সমর্থক ছিলেন এবং তাঁর জীবন ছিল বিতর্কমুক্ত।
উত্তরাধিকার: হলিউডের এক যুগের অবসান
রবার্ট রেডফোর্ডের মৃত্যু হলিউডের জন্য একটি বড় ক্ষতি। তাঁর মতো তারকা যাঁরা বাণিজ্যিক সাফল্য এবং শিল্পমানের মিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন, তাঁরা কম। ভ্যারাইটি ম্যাগাজিন বলেছে, “তিনি ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মের গডফাদার ছিলেন।” তাঁর ফিল্মগুলো আজও দর্শককে অনুপ্রাণিত করে। পরিবারের অনুরোধে কোনো বিস্তারিত শ্মশান অনুষ্ঠানের খবর এখনও নেই। সারা বিশ্ব তাঁকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছে।


