আবহাওয়া ভারত প্রযুক্তি বিনোদন বিদেশ খেলা শেয়ার বাজার

‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’ ভারতে দমকা ঝড় তুলেছে

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের এক বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে দেশের যুবসমাজ যেন জাগ্রত হয়েছে। ‘তেলাপোকা’, ‘সমাজের পরজীবী’ – এই আখ্যা দেওয়া বেকার ও বিরক্ত যুবকরা এখন নিজেদের সংগঠিত করছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP) নামে একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই অনলাইন জগতে দলটির অনুসারীর সংখ্যা কয়েক কোটি ছাড়িয়েছে, যা দেশের ভোট রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কীভাবে শুরু?

গত ১৫ মে সুপ্রিম কোর্টের এক শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত মন্তব্য করেন, “এমন কিছু যুবক আছে যারা তেলাপোকার মতো। তাদের কোনো চাকরি নেই, পেশায় কোনো স্থান নেই। তাদের কেউ কেউ মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়া, আরটিআই অ্যাক্টিভিস্ট হয়ে যায় এবং তারা সবাইকে আক্রমণ করতে শুরু করে।” এই মন্তব্যকে ‘বেকার যুবকদের অপমান’ হিসেবে চিহ্নিত করে প্রতিক্রিয়া দেখান সাবেক আম আদমি পার্টির সোশ্যাল মিডিয়া স্ট্রাটেজিস্ট অভিজিৎ দীপকে

পরের দিনই (১৬ মে) তিনি এক্স (সাবেক টুইটার)-এ এক পোস্টে ‘সব তেলাপোকার জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম’ ঘোষণা করেন। যুক্ত হওয়ার শর্ত করা হয়: বেকার (জোর করে, পছন্দ করে বা নীতিগতভাবে), অলস (শুধু শারীরিক পরিশ্রমের ক্ষেত্রে), ক্রনিকলি অনলাইন (দিনে অন্তত ১১ ঘণ্টা) এবং পেশাদার মানের বকবক করার ক্ষমতা থাকতে হবে।

দলটির অবস্থান ও ইশতেহার

যদিও এটি একটি ব্যঙ্গাত্মক দল, তবুও তারা পাঁচ দফা ইশতেহার দিয়েছে, যা দেশের জটিল কিছু সমস্যার দিকেই ইঙ্গিত করছে:

১. বিচারপতির রাজ্যসভায় যাওয়া বন্ধ: অবসরের পর কোনো প্রধান বিচারপতি রাজ্যসভার সদস্য পদ পাবেন না।
২. ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটা সন্ত্রাসবাদ: কোনো বৈধ ভোটার যদি তালিকা থেকে বাদ পড়েন, তাহলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ইউএপিএ ধারায় মামলা হবে।
৩. নারী সংরক্ষণ ৫০%: বর্তমান ৩৩%-এর বদলে ৫০% আসন ও মন্ত্রিসভার ৫০% পদ নারীদের জন্য সংরক্ষিত করতে হবে।
৪. আদানি-অম্বানি মালিকানাধীন মিডিয়ার লাইসেন্স বাতিল: স্বাধীন ও গণমাধ্যমের স্বার্থে এই দুই গ্রুপের মালিকানাধীন সব মিডিয়া হাউসের লাইসেন্স বাতিলের দাবি।
৫. দলত্যাগ করলে ২০ বছরের জন্য অযোগ্যতা: কোনো এমপি বা এমএলএ দলত্যাগ করলে ২০ বছরের জন্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না।

এছাড়া দলটি ইলেক্টোরাল বন্ড ও বেনামি দান গ্রহণ করবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে।

কেন এই দল এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে?

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধান বিচারপতির ‘তেলাপোকা’ মন্তব্য নিঃসন্দেহে অনুঘটকের কাজ করলেও, এর চেয়ে বড় কারণ ভারতের যুবসমাজের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও হতাশা। দেশে বর্তমানে স্নাতক বেকারত্বের হার ২৯.১% , যা কখনো স্কুলে না যাওয়া মানুষের বেকারত্বের হারের (৩.২%) তুলনায় প্রায় ন’গুণ বেশি। প্রতি বছর ৮০ লাখের বেশি স্নাতক বেরোচ্ছে, কিন্তু কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না।

প্রধান বিচারপতি অবশ্য পরের দিন এক বিবৃতিতে দাবি করেন, তাঁর মন্তব্য ভুল অর্থে নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, তিনি বিশেষ করে ভুয়া ডিগ্রি নিয়ে আইনি পেশায় ঢুকে পড়া কিছু মানুষকে ‘তেলাপোকা’ বলেছেন, দেশের সব বেকার যুবককে নয়। কিন্তু ততক্ষণে দমকা হাওয়ার মতো ছড়িয়ে পড়ে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’।

তারুণ্যের ‘মিম রাজনীতি’ নাকি বাস্তব আন্দোলন?

এক্স এবং ইনস্টাগ্রামে দলটির ফলোয়ার এখন ১ কোটির বেশি। অনলাইনে ফর্ম পূরণ করে সদস্য হয়েছেন আরও ৩.৫ লাখের বেশি মানুষ। তৃণমূল কংগ্রেসের দুই সাংসদ মহুয়া মৈত্র ও কীর্তি আজাদ এই দলে আগ্রহ জানিয়েছেন। আইনজীবী পৃথ্বীশ ভূষণ-ও সমর্থন জানিয়েছেন।

কেউ কেউ একে ‘মেম রাজনীতি’ বললেও অনেকে মনে করছেন, এটি ‘ভারতের জেন জেড রাজনীতির নতুন মুখ’। ইউটিউবার মেঘনাদ এস বলেন, “ককরোচ জনতা পার্টি একটি ব্যঙ্গাত্মক, অস্তিত্বহীন দল, অথচ মানুষ মনে করে এটি বাস্তবতার চেয়েও ভালো বিকল্প। এটাই ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলো সম্পর্কে বড় মন্তব্য।”

নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন?

আল জাজিরার খবর অনুযায়ী, দলটির সমর্থকরা বিহারের বাঁকিপুর বিধানসভা উপ-নির্বাচনে প্রথম প্রার্থী দেওয়ার কথা ভাবছেন। যদিও দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে স্বীকার করেছেন, “আমি প্রলাপ বকছি না, জানি এটা কয়েকদিনেই মিলিয়ে যেতে পারে। তবে অন্তত একটি জায়গা তৈরি করতে চাই, যেখানে যুবকদের কথা শোনা হবে।”

,

Ismail

ইসমাইল বাংলা টাইমসের নিয়মিত লেখক এবং স্বাধীন সাংবাদিক। তিনি রাজনীতি, ক্রিকেট, আবহাওয়া, প্রযুক্তি এবং সমসাময়িক জাতীয়-আন্তর্জাতিক ঘটনা নিয়ে সহজবোধ্য ও তথ্যসমৃদ্ধ লেখনী উপস্থাপন করেন। বর্তমান ভারতীয় রাজনীতি, নির্বাচনী বিশ্লেষণ, খেলাধুলা এবং জনজীবনের নানা বিষয়ে তাঁর লেখা পাঠকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়।

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Exit mobile version