ইরানের রাজধানী তেহরানের রেভল্যুশন স্কয়ার (Enghelab Square) গতকাল (১৮ মার্চ ২০২৬) যেন সমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। হাজার হাজার, এমনকি কিছু প্রতিবেদনে লাখের কাছাকাছি মানুষ এসেছিলেন আলি লারিজানির জানাজায়। প্রশ্ন উঠছে স্বাভাবিকভাবেই—কে ছিলেন এই লোক? কেন তার মৃত্যুতে এত বিশাল জনসমাগম? কেন তার জানাজা শুধু একজন ব্যক্তির বিদায় নয়, বরং একটা জাতীয় প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠল?
আলি লারিজানি কে ছিলেন?
আলি লারিজানি (জন্ম ১৯৫৮) ইরানের রাজনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার একজন কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন দীর্ঘদিন ধরে। তিনি ছিলেন:
- ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (SNSC) সেক্রেটারি (দায়িত্বে থাকাকালীন দেশের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নীতি নির্ধারণের দায়িত্বে)
- ইরানের পার্লামেন্টের (মজলিস) সাবেক স্পিকার (২০০৮-২০২০)
- ইরানি রেভল্যুশনারি গার্ডসের (IRGC) সঙ্গে গভীর যোগাযোগ
- আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং তার পরামর্শদাতা
খামেনির মৃত্যুর পর (ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায়) লারিজানিকে অনেকেই ইরানের “অন্তর্বর্তীকালীন নেতা” বা “স্ট্যান্ড-ইন লিডার” হিসেবে দেখতেন। তিনি দেশের নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিলেন যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে।
কীভাবে মারা গেলেন?
১৭ মার্চ ২০২৬-এ ইসরায়েলি বিমান হামলায় তেহরানের কাছে নিহত হন লারিজানি। তার সঙ্গে নিহত হন তার ছেলে মর্তজা লারিজানি, SNSC-এর কয়েকজন সিনিয়র অফিসার ও দেহরক্ষী। একই দিনে বা তার আশেপাশে আরও কয়েকজন শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা (যেমন বাসিজ প্রধান ঘোলামরেজা সোলেইমানি) নিহত হন। এছাড়া সম্মিলিত জানাজায় ছিল ইরানি নৌবাহিনীর ডেনা জাহাজের ৮৪ জন নাবিকের লাশ—যারা মার্চের শুরুতে মার্কিন বাহিনীর টর্পেডো হামলায় নিহত হয়েছিল।
জানাজায় এত লোক কেন?
জানাজায় বিশাল জনসমাগমের কয়েকটি প্রধান কারণ:
- শহীদত্বের প্রতীক: ইরানি শিয়া সংস্কৃতিতে “শহীদ” (martyr) হওয়া অত্যন্ত সম্মানের। ইসরায়েল-মার্কিন হামলায় নিহত হওয়া লারিজানিকে “শহীদ” ঘোষণা করা হয়েছে। এতে জনগণের মধ্যে ধর্মীয়-জাতীয় আবেগ জাগ্রত হয়।
- জাতীয় প্রতিরোধ ও ঐক্যের প্রদর্শন: চলমান যুদ্ধে (ইরান-ইসরায়েল-মার্কিন যুদ্ধ) এই জানাজা শুধু শোক নয়, বরং “প্রতিশোধ” ও “প্রতিরোধ”-এর বার্তা। জনতা ইরানি পতাকা, শহীদদের ছবি নিয়ে “আল্লাহু আকবর” ধ্বনি দিয়েছে, যা সরকারের সমর্থন ও যুদ্ধের প্রতি প্রতিশ্রুতি দেখায়।
- লারিজানির ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও প্রভাব: তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পদে ছিলেন—পার্লামেন্ট স্পিকার থেকে নিরাপত্তা প্রধান। অনেকে তাকে “যুক্তিবাদী” (moderate/pragmatic) রাজনীতিবিদ হিসেবে দেখতেন, যিনি কঠোরপন্থী ও মধ্যপন্থীদের মাঝে সেতুবন্ধন করতেন। তার মৃত্যুকে “ব্যবস্থার জন্য বড় ক্ষতি” বলে বর্ণনা করা হচ্ছে।
- সরকারি সংগঠন ও মোবিলাইজেশন: ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস, বাসিজ ও সরকারি মিডিয়া (Fars, Tasnim, PressTV) ব্যাপকভাবে জনগণকে জানাজায় অংশ নিতে উৎসাহিত করেছে। এ ধরনের রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে প্রায়ই বড় জমায়েত হয়।
- যুদ্ধকালীন মনস্তত্ত্ব: যখন দেশ আক্রান্ত, তখন জনগণের একাংশ স্বাভাবিকভাবে শাসকগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ায়। লারিজানির জানাজা সেই “ঐক্যের প্রদর্শনী” হয়ে উঠেছে।
শেষ কথা
আলি লারিজানির জানাজায় এত লোক শুধু একজন ব্যক্তির জন্য নয়—এটা ইরানের বর্তমান যুদ্ধ, শহীদত্বের আবেগ, জাতীয় গর্ব এবং “শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ”-এর প্রতীক। কেউ কেউ বলছেন এটা সরকারি প্রচারণার ফল, কেউ বলছেন সত্যিকারের জন-আবেগ। কিন্তু যাই হোক, তেহরানের রাস্তায় যে সাগর জেগে উঠেছিল, তা স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—ইরান এখনো হার মানেনি।


