কলকাতা, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ (টাইমস অফ ইন্ডিয়া বিশেষ প্রতিবেদন): পশ্চিমবঙ্গে শারদীয়া দুর্গাপূজার প্রস্তুতি এখন চরমে। মাত্র ১১ দিন বাকি থাকতে কুমরটুলির কুমোররা প্রতিমা গড়ায় ব্যস্ত, প্যান্ডেল নির্মাণকারীরা রাত জেগে কাজ করছেন এবং সারা রাজ্যে উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে। আজকের দিনে বিশ্বকর্মা পূজার ছুটির ঘোষণা নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে বিশেষ উল্লাস। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই সিদ্ধান্ত দুর্গাপূজার প্রাক্কালেই শ্রমিক শ্রেণির জন্য একটি বড় উপহার। এছাড়া, ইউনেস্কোর স্বীকৃত এই উৎসবের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার ইতিমধ্যে ‘আসান’ পূজা অনুমতি পোর্টাল চালু করেছে, যা ৪৫,০০০-এর বেশি পূজা কমিটিকে সাহায্য করবে।
দুর্গাপূজা ২০২৫-এর তারিখসূচি অনুযায়ী, মহালয়া ২১ সেপ্টেম্বর রবিবার। এরপর ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ২ অক্টোবর পর্যন্ত মূল উদযাপন—মহাষষ্ঠী, মহাসপ্তমী, মহাষ্টমী, মহানবমী এবং বিজয়াদশমী। পশ্চিমবঙ্গে স্কুল, কলেজ, সরকারি অফিস এবং ব্যাঙ্কগুলো এই পাঁচ দিন বন্ধ থাকবে। আরআইবিআই-এর নির্দেশ অনুযায়ী, ব্যাঙ্কগুলো ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ২ অক্টোবর বন্ধ। এছাড়া, ১৭ সেপ্টেম্বর বিশ্বকর্মা পূজার জন্য সরকারি ছুটি ঘোষণা হয়েছে, যা দুর্গাপূজার প্রস্তুতিকে আরও গতি দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জলপাইগুড়িতে প্রকল্প উদ্বোধনের সময় বলেছেন, “শ্রমিক ভাইদের বিশ্বকর্মা পূজাকে সম্মান জানানো আমাদের দায়িত্ব। এই ছুটি তাদের জন্য একটি ছোট উপহার।”
কলকাতার কুমরটুলিতে আজও প্রতিমা নির্মাণের কাজ চলছে। ঐতিহ্যগতভাবে এখানে হাজার হাজার প্রতিমা তৈরি হয়, যা সারা দেশে পাঠানো হয়। গতকাল (১৬ সেপ্টেম্বর) তেলেঙ্গাবাগান এবং কুমরটুলি সর্বজনীন পূজা কমিটির প্যান্ডেলে চূড়ান্ত পর্যায়ের কাজ দেখা গেছে। এবছরের থিমগুলো বিশেষ আকর্ষণীয়—কুমরটুলি সর্বজনীনের প্যান্ডেলে বাংলার বিখ্যাত কার্টুন চরিত্রগুলোর উপর ভিত্তি করে নকশা। শিল্পীরা বলছেন, “এবছর প্রতিমাগুলোতে ইকো-ফ্রেন্ডলি উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে বিসর্জনের সময় পরিবেশের ক্ষতি না হয়।”
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘আসান’ পোর্টালের মাধ্যমে পূজা কমিটিগুলো অনলাইনে অনুমতি পাচ্ছে, যা অগ্নিশামন, বিদ্যুৎ, পুলিশ সহ সব অনুমোদন সহজ করেছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনা থেকে শুরু হয়ে এখন সারা রাজ্যে এটি ছড়িয়ে পড়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, “দুর্গাপূজা আমাদের সংস্কৃতির প্রতীক। এবছরও এটি নিরাপদ এবং উজ্জ্বল হবে।” ইউনেস্কো ২০২১ সালে ‘কলকাতার দুর্গাপূজা’কে অস্পর্শযোগ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান দিয়েছে, যা এই উৎসবকে বিশ্বমানের করে তুলেছে।
ঐতিহাসিকভাবে, দুর্গাপূজা মহিষাসুরের উপর দেবীর বিজয়ের প্রতীক। বাংলায় এটি মধ্যযুগ থেকে উদযাপিত, এবং আধুনিককালে এটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। এবছর দেবীর আগমন হবে হাতির পিঠে (গজ), যা ফুল পঞ্জিকা অনুযায়ী শস্যশ্যামলা ফলের ইঙ্গিত দেয়। তবে গমন হবে দোলায়, যা কিছু অশুভ সংকেতও বহন করে। তবু, উৎসবের আনন্দে সবাই মগ্ন।
দুর্গাপূজার সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য উৎসব: ৬ অক্টোবর কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা এবং ২০ অক্টোবর কালীপূজা। পশ্চিমবঙ্গে এই সময়টি অর্থনৈতিকভাবেও উজ্জ্বল—হস্তশিল্প, সংগীত, নৃত্য এবং খাবারের মেলায় লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম ঘটে। পর্যটকরা কলকাতার প্যান্ডেল হপিংয়ে মুগ্ধ হয়। সরকার নিরাপত্তা এবং পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে।
এবছরের দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় নয়, সাংস্কৃতিক ঐক্যের প্রতীক হবে। বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে এটি সবচেয়ে বড়। প্রস্তুতি চলছে, এবং আগামী দিনগুলোতে আরও খবর আসবে। শুভ দুর্গাপূজা!


