পশ্চিমবঙ্গে আবহাওয়ার করাল রূপ সামনে এসেছে। ভারতীয় উল্লেখযোগ্য অফিস (আইএমডি)-এর পূর্বাভাস অনুসারে, কলকাতাসহ রাজ্যের একাধিক জেলায় আজ থেকে শুরু করে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ভারী থেকে প্রবল বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে দুর্গাপূজার দশমী তিথিতে (২ অক্টোবর) এই বৃষ্টি চরম আকার ধারণ করতে পারে, যা উৎসবের আনন্দকে জলে ভাসিয়ে দিতে পারে। সাম্প্রতিকতম তথ্য অনুসারে, কলকাতায় ৭-১১ সেন্টিমিটার বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা গুরুতর জলাবদ্ধতার কারণ হবে।
আইএমডির সর্বশেষ সতর্কতা বুলেটিনে বলা হয়েছে, দক্ষিণবঙ্গের কলকাতা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর, উত্তর ২৪ পরগনা, হুগলি, পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, পূর্ব বর্ধমান, হাওড়া, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ এবং বীরভূম জেলাগুলিতে ভারী থেকে প্রবল বৃষ্টি (৬৪.৫-২০৪.৪ মিলিমিটার) হবে। উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, উত্তর দিনাজপুর, মালদা এবং দক্ষিণ দিনাজপুর জেলাগুলিও এর আওতায় পড়েছে। এছাড়া, পূর্ব মেদিনীপুর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় বজ্রপাতসহ ঝড়ো হাওয়া (৫০ কিলোমিটার/ঘণ্টা গতিতে) এবং অন্যান্য দক্ষিণবঙ্গ জেলায় ৩০-৪০ কিলোমিটার/ঘণ্টা বায়ু অবিরাম বইবে।
এই বৃষ্টির কারণ বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ এলাকার সৃষ্টি। আইএমডির পূর্বাভাস মতে, ২ থেকে ৪ অক্টোবরের মধ্যে রাজ্যের অধিকাংশ স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে প্রবল বৃষ্টি হবে, এবং সমুদ্রের অবস্থা রুক্ষ থাকবে। ফলে, পশ্চিমবঙ্গ-ওড়িশা উপকূলে মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বায়ুর গতি ৩৫-৪৫ কিলোমিটার/ঘণ্টা হতে পারে, যা আরও ৫৫ কিলোমিটার/ঘণ্টায় পৌঁছাতে পারে।
সরকারি পর্যায়ে প্রস্তুতি চলছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরিস্থিতির নিবিড় নজরদারি করছেন। সকল সংশ্লিষ্ট বিভাগকে সতর্ক করা হয়েছে এবং পূজার সময়কালে (২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ৭ অক্টোবর) একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে একজন সিনিয়র আইএএস অফিসার দিনরাত তত্ত্বাবধান করবেন। এছাড়া, ২০-২৪ অক্টোবর এবং ২৭-২৮ অক্টোবরও এই কক্ষ সক্রিয় থাকবে। স্থানীয় প্রশাসনগুলিকে জলাবদ্ধতা, আন্ডারপাস রাস্তায় পানি জমা এবং যানজটের জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই পটভূমিতে সাম্প্রতিক ঘটনা মনে পড়িয়ে দিচ্ছে। মাত্র এক সপ্তাহ আগে, ২৩-২৪ সেপ্টেম্বর কলকাতায় ২৫১.৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, যা ১৯৮৮ সালের পর সর্বোচ্চ। এতে কমপক্ষে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে—কলকাতায় ৯ জন, বেশিরভাগ বিদ্যুৎস্পর্শে, এবং দু’জন ডুবে মারা গেছে। রাস্তায় কোমর পর্যন্ত পানি জমে যানজট, ট্রেন-ফ্লাইট বিলম্ব এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাট সৃষ্টি হয়েছে। দুর্গাপূজার প্রস্তুতিতে প্যান্ডেল ও মূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকার তাৎক্ষণিক জল সরানোর জন্য পাম্প মোতায়েন করেছে, খাবার বিতরণ করেছে এবং স্কুল-কলেজ বন্ধ রেখেছে।
কলকাতার জরাজীর্ণ ও বন্ধ নর্দমা ব্যবস্থা এই ধরনের বৃষ্টিতে ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শহরের নর্দমা ব্যবস্থা দীর্ঘদিনের অবহেলায় ক্লগড হয়ে গেছে, যা জলাবদ্ধতাকে আরও তীব্র করে। ক্যালকাটা হাইকোর্টও এ নিয়ে রাজ্য সরকার ও কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের কাছে রিপোর্ট চেয়েছে।
দুর্গাপূজার এই উৎসবমুখর সময়ে আবহাওয়ার এই করালতা পূজোকারীদের মুখে হাসি ফোটাতে পারেনি। বিশেষ করে দশমীতে বিসর্জনের সময় বৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতা ও যানজটের কারণে উৎসব বিঘ্নিত হবে। নাগরিকরা সতর্কতা অবলম্বন করুন—নিম্নভূমি এড়িয়ে চলুন, বিদ্যুৎস্পর্শের ঝুঁকি কমান এবং আইএমডির সতর্কতা মেনে চলুন। রাজ্য সরকার জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।


