পশ্চিমবঙ্গের চিরাচরিত আমের গন্ধে এখন ভোরের বাতাস ভারী। ফাল্গুনের এই শুরুতেই রাজ্যের একাধিক জেলায় আমগাছ প্রকৃতির নিজস্ব রং ছড়াতে শুরু করেছে। মুকুলে মুকুলে ভরে উঠেছে গাছের ডালপালা। চাষিদের চোখে এখন স্বপ্ন, আর কপালে চিন্তার ভাঁজ—আবহাওয়া কি সেই স্বপ্নকে সফল করতে দেবে?
জেলায় জেলায় মুকুলের সমারোহ
পশ্চিমবঙ্গের আম চাষের মানচিত্রে এ বছর ব্যতিক্রমী ছবি দেখা যাচ্ছে। মুকুল এতটাই বেশি এসেছে যে, গাছের ডালপালা প্রায় নুইয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মালদহ, মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুর এবং নদিয়া জেলার বিভিন্ন আমবাগান ঘুরলে চোখে পড়বে মুকুলের এই ছড়াছড়ি।
- মালদহ জেলা: ইংরেজবাজার, কালিয়াচক ও রতুয়া অঞ্চলের বাগানগুলিতে লক্ষ্মণভোগ, হিমসাগর ও ফজলির মুকুলের দেখা মিলেছে ব্যাপক হারে।
- মুর্শিদাবাদ জেলা: লালগোলা ও ভগবানগোলার আমচাষিরা জানাচ্ছেন, গত কয়েক বছরের মধ্যে এ বছর সবচেয়ে বেশি মুকুল এসেছে। বিশেষ করে ভোগনা ও লাঙড়া জাতের গাছগুলিতে মুকুলের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে বাগান।
- উত্তর দিনাজপুর: রায়গঞ্জ ও হেমতাবাদের চাষিরাও কম যান না। তারাও মুকুলের প্রাচুর্যে খুশি।
মুকুল বেশি এলেও শঙ্কা আবহাওয়া নিয়ে
আম চাষিদের একটি পুরনো কথা আছে, “আষাঢ়ে কলা, ফাল্গুনে ফুল, বৈশাখে মধু নিয়ে আসে ভুল।” তবে এই ফুলই যে ফল হয়ে গাছে ঝুলবে, তার পুরো নির্ভরতা এখন আবহাওয়ার ওপর। চাষিদের প্রধান শঙ্কা— অসময়ে বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি বা তাপমাত্রার আকস্মিক পরিবর্তন।
মালদহ জেলার চাষি বিভাস সাহা জানাচ্ছেন, “এমন প্রচুর মুকুল এর আগে দেখিনি। গাছ ভরে গিয়েছে। কিন্তু মন খারাপ হচ্ছে এই ভয়ে যে, যদি হঠাৎ করে বৃষ্টি এসে পড়ে বা শিলা পড়ে, তাহলে সব শেষ। মুকুল পচে যাবে, ঝরে পড়বে।”
মুকুল আসার পর সবচেয়ে বড় শত্রু হচ্ছে:
- শিলাবৃষ্টি ও ঝড়হওয়া: এপ্রিলের শুরুতে পশ্চিমী ঝঞ্ঝার কারণে প্রায়ই শিলাবৃষ্টি হয়, যা আমের মুকুলের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
- অতি বৃষ্টি ও ফগ: মুকুল অবস্থায় বৃষ্টি পড়লে ফাঙ্গাসের সংক্রমণ বাড়ে এবং মুকুল ঝরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সকালের ঘন কুয়াশাও মুকুলের জন্য ভালো নয় ।
- তাপমাত্রার ওঠানামা: দিনের বেলা বেশি গরম ও রাতে ঠাণ্ডা থাকলে মুকুলের পরাগায়ণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। ভারতে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার ওঠানামা ইতিমধ্যেই আম উৎপাদনকে অনিশ্চিত করে তুলেছে ।
চাষিদের ব্যস্ততা ও প্রত্যাশা
মুকুল আসার পর থেকেই বাগানে পোকামাকড়ের আক্রমণ প্রতিরোধে স্প্রে করা, গাছের গোড়ায় পানি ও সার দেওয়া—এই কাজেই এখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন চাষিরা। মুর্শিদাবাদের চাষি আব্দুল হাই জানান, “আমাদের চেষ্টা থাকে মুকুল যেন ভালো থাকে। কীটনাশক স্প্রে করছি নিয়ম মেনে। কিন্তু প্রকৃতির কাছে আমরা কেউই বড় নই। শেষ হাসি কে হাসবে, সেটা একমাস পরেই বোঝা যাবে।”
সামগ্রিক চিত্র
এ বছর পশ্চিমবঙ্গের আমের মৌসুমের শুরুটা হয়েছে স্বপ্নের মতো। তবে স্বপ্ন বাস্তব হতে গেলে চাই অনুকূল আবহাওয়া। বৈশাখের রোদে যদি মুকুল থেকে ফল ধরে এবং ফল যদি পাকতে শুরু করে, তবেই চাষিদের মুখে হাসি ফুটবে। আপাতত সবাই তাকিয়ে রয়েছে আকাশপানে।

