ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী এবং স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাশিয়া রোববার ভোররাতে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র ও স্ট্রাইক ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। এই হামলায় কমপক্ষে একজন নিহত এবং পাঁচজন আহত হয়েছে বলে জানা গেছে।
রাতভর এই হামলায় রাজধানী কিয়েভ ও তার আশপাশের এলাকা, কৃষ্ণ সাগর বন্দর ওডেসা এবং মধ্য ইউক্রেনের বিভিন্ন স্থান লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে ইউক্রেনের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
প্রধান লক্ষ্য ছিল জ্বালানি খাত
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে জানান, হামলায় দনিপ্রো, কিরোভোহরাদ, মিকোলাইভ, পোলতাভা ও সুমি অঞ্চলও লক্ষ্যবস্তু হয়। তিনি বলেন, “হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল জ্বালানি খাত, তবে আবাসিক ভবন ও রেললাইনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”
জেলেনস্কি আরও অভিযোগ করেন, “মস্কো কূটনীতির চেয়ে হামলায় বেশি বিনিয়োগ করছে।” তিনি জানান, এই সপ্তাহেই একা রাশিয়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ১,৩০০-এর বেশি ড্রোন, ১,৪০০-এর বেশি নির্দেশিত বোমা এবং ৯৬টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
বিস্তারিত হামলার চিত্র
- হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতি: কিয়েভ অঞ্চলের গভর্নর মিকোলা কালাশনিক টেলিগ্রামে জানান, এই অঞ্চলের পাঁচটি জেলায় হামলা হয়েছে, যেখানে এক ডজনের বেশি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে একজনের মৃত্যু ও পাঁচজনের আহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
- ওডেসায় হামলা: ওডেসার গভর্নর ওলেহ কিপার টেলিগ্রামে জানান, রাতে ড্রোন হামলায় এই অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোতে অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়, যা পরে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।
- বিমান বাহিনীর তথ্য: ইউক্রেনের বিমান বাহিনী জানায়, রাতভর হামলায় রাশিয়া মোট ৫০টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২৯৭টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছিল। এর মধ্যে ইউক্রেনের বায়ু প্রতিরক্ষা বাহিনী ৩৩টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২৭৪টি ড্রোন ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছে।
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা এক্স-এ এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “এই সন্ত্রাসকে স্বাভাবিক করা যাবে না, এটি বন্ধ করতে হবে।” তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি ক্রেমলিনের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানান।
যুদ্ধ ও কূটনীতির প্রেক্ষাপট
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণ মাত্রায় আক্রমণ শুরুর পর থেকে জ্বালানি বিদ্যুৎকেন্দ্র, ট্রান্সমিশন লাইন ও গ্যাস খাতে হামলা যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি শান্তি চুক্তি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গত ১৭ ও ১৮ ফেব্রুয়ারি জেনেভায় অনুষ্ঠিত সর্বশেষ আলোচনাতেও কোনো অগ্রগতি হয়নি। রাশিয়া ইউক্রেনের কাছে পূর্বাঞ্চলীয় দনবাসের কিছু অংশ থেকে সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছে, যা কিয়েভ প্রত্যাখ্যান করেছে।
হামলার বিষয়ে রাশিয়ার পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে মস্কো বারবার বলেছে যে, তারা বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে না। মস্কোর দাবি, ইউক্রেনের জ্বালানি ও বেসামরিক অবকাঠামো বৈধ লক্ষ্যবস্তু, কারণ এগুলো ধ্বংস করলে কিয়েভের যুদ্ধ চালানোর সক্ষমতা হ্রাস পায়। অন্যদিকে কিয়েভের অভিযোগ, রাশিয়ার আসল লক্ষ্য বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে কষ্ট দেওয়া এবং দেশটির মনোবল ভাঙা।
উপসংহার
রাশিয়ার এই সর্বশেষ বড় ধরনের হামলা আবারও ইউক্রেনের জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর চলমান হুমকিকে তুলে ধরে। শীতকাল শেষ হলেও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর এই হামলা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলমান থাকলেও, যুদ্ধক্ষেত্রে এই ধরনের হামলা যেকোনো শান্তি প্রক্রিয়ার পথকে আরও কঠিন করে তুলবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।