আগামী বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অনুষ্ঠেয় তৃতীয় দফার পরমাণু আলোচনা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে তেহরান। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, সাম্প্রতিক আলোচনায় উভয় পক্ষের মধ্যে বাস্তবসম্মত প্রস্তাব বিনিময় হয়েছে এবং তা থেকে ‘উৎসাহব্যঞ্জক সংকেত’ পাওয়া গেছে।
রোববার এক বিবৃতিতে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এই ইতিবাচক ইঙ্গিত সত্ত্বেও যেকোনো পরিস্থিতির জন্য ইরান পুরোপুরি প্রস্তুত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি পারমাণবিক চুক্তি না হলে ‘খুব খারাপ কিছু’ ঘটতে পারে বলে হুমকি দেওয়ার প্রেক্ষাপটে তার এই মন্তব্য এল। পাশাপাশি, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতিও বাড়ানো হচ্ছে।
পেজেশকিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, “ইরান এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ। সাম্প্রতিক আলোচনায় ব্যবহারিক প্রস্তাব বিনিময় হয়েছে এবং তা উৎসাহব্যঞ্জক সংকেত দিয়েছে। তবে আমরা মার্কিন পদক্ষেপ ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছি এবং যেকোনো সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি।”
ওমানের ভূমিকা ও আলোচনার পটভূমি
ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল বুসাইদি নিশ্চিত করেছেন যে, ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তৃতীয় দফার এই পরোক্ষ আলোচনা বৃহস্পতিবার জেনেভায় অনুষ্ঠিত হবে। ওমান উভয় পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে।
আল বুসাইদি বলেন, “আমি নিশ্চিত করতে পেরে আনন্দিত যে, ইরান-মার্কিন আলোচনা এখন এই বৃহস্পতিবার জেনেভায় নির্ধারিত হয়েছে। চুক্তি চূড়ান্ত করার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানোর বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে।”
এর আগে, এ মাসের শুরুর দিকে ওমানে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা শুরু হয় এবং গত সপ্তাহে জেনেভায় দ্বিতীয় দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। যদিও উভয় পক্ষই আলোচনাকে সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক বলে বর্ণনা করেছে, তাতে কোনো বড় অগ্রগতি হয়নি।
মার্কিন অবস্থান: ‘আত্মসমর্পণ না করার কারণ কী?’
মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, যিনি ওয়াশিংটনের পক্ষে পরমাণু আলোচনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন, শনিবার এক সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কৌতূহলী কেন ইরান এখনও তার পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করতে ‘আত্মসমর্পণে’ রাজি হয়নি।
ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে উইটকফ বলেন, “তিনি (ট্রাম্প) কেন তারা আত্মসমর্পণ করেনি সে ব্যাপারে কৌতূহলী… এই চাপের মুখে, এত বিশাল নৌশক্তি সামনে রেখে, কেন তারা এসে বলেনি যে আমরা অস্ত্র চাই না, তাই আমরা এটা করতে প্রস্তুত?”
তিনি ইঙ্গিত দেন, বর্তমানে এই অঞ্চলে মার্কিন যে সামরিক শক্তি জড়ো করা হয়েছে, তা ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর থেকে সবচেয়ে বড়। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে ১২০টির বেশি বিমান মোতায়েন করা হয়েছে এবং বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড-কে আরব সাগরে ইতিমধ্যে অবস্থানরত আরেকটি স্ট্রাইক গ্রুপের সাথে যুক্ত করা হচ্ছে।
ইরানের জবাব: ‘কেন আত্মসমর্পণ করব না? কারণ আমরা ইরানি’
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি উইটকফের এই মন্তব্যের জবাবে এক্স-এ লেখেন, “কেন আমরা আত্মসমর্পণ করব না, তা জানতে চান? কারণ আমরা ইরানি।”
সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ইরানিদের জন্য ‘মর্যাদা ও গর্বের’ বিষয়। “আমরা নিজেরা, আমাদের বিজ্ঞানীদের মাধ্যমে এই প্রযুক্তি তৈরি করেছি, এটি আমাদের জন্য খুবই প্রিয়, কারণ আমরা এটি তৈরি করেছি – এর জন্য বিপুল মূল্য দিতে হয়েছে।”
তিনি এই মূল্যের মধ্যে দুই দশকের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, ইরানি বিজ্ঞানীদের লক্ষ্যবস্তু করে হত্যা এবং গত বছর জুনে মার্কিন-ইসরায়েলি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার কথা উল্লেখ করেন।
আরাগচি জোর দিয়ে বলেন, “আমরা আমাদের (পারমাণবিক কর্মসূচি) ছেড়ে দিচ্ছি না; এটি ছাড়ার কোনো আইনি কারণ নেই, বিশেষ করে যখন আইএইএ’র তত্ত্বাবধানে সবকিছু শান্তিপূর্ণ ও সুরক্ষিত।” তিনি আরও বলেন, ইরান পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) অধীনে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি ও সমৃদ্ধকরণের অধিকার রাখে এবং এই বিষয়টিই আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু।
দ্রুত চুক্তির সম্ভাবনা ও জটিলতা
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি জানান, ইরান পরবর্তী বৈঠকে একটি খসড়া উপস্থাপনের জন্য কাজ করছে, যাতে উভয় পক্ষের উদ্বেগ ও স্বার্থ সংরক্ষণ করে ‘দ্রুত চুক্তি’ সম্ভব হয়। তিনি দাবি করেন, এই চুক্তি ২০১৫ সালের জেসিপিওএ’র চেয়েও ‘ভালো’ হতে পারে।
তবে বিশ্লেষকরা আশাবাদের পাশাপাশি সম্ভাব্য বাস্তবতা নিয়েও সতর্ক করেছেন। কুইন্সি ইনস্টিটিউটের ট্রিটা পার্সি আল জাজিরাকে বলেন, ইরান সম্ভবত আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ছাড় দিয়ে একটি প্রস্তাব দিতে পারে, কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলের দেওয়া এমন একটি বর্ণনায় বিশ্বাসী হতে পারে, যেখানে ইরানকে তার প্রকৃত অবস্থানের চেয়ে অনেক দুর্বল দেখানো হয়েছে। ফলে তিনি এমন অযৌক্তিক দাবি তুলতে পারেন, যা বাস্তবে সম্ভব নয়।
অন্যদিকে, ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সাবেক পরিচালক মার্ক ফিট্জপ্যাট্রিক মনে করেন, শূন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ইরানের কাছে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। তিনি ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর মধ্যে নীতিগত সম্ভাব্য বিভাজনের ইঙ্গিত দেন, যেখানে ট্রাম্প শুধু পারমাণবিক হুমকি নিরসনে মনোযোগী, কিন্তু ইসরায়েল ইরানের বলয়কে ধারণ করার একটি বৃহত্তর কৌশল চায়।
গত বছর ইসরায়েলের হামলা এবং ইরানে বিক্ষোভ দমনের ঘটনার পর এই অঞ্চলে উত্তেজনা চরমে ওঠে। ট্রাম্প জানুয়ারিতে সামরিক পদক্ষেপের নতুন হুমকি দিলে ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার হুমকি দেয়। এরপর থেকেই ওমান, কাতার ও সৌদি আরবের মধ্যস্থতায় কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হয়। এবারের জেনেভা বৈঠক সেই প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় কতদূর সাফল্য পায়, সেদিকেই তাকিয়ে আন্তর্জাতিক মহল।