ভারতের লোকসভায় ‘বন্দে মাতরম’-এর ১৫০ বর্ষপূর্তির বিশেষ আলোচনায় এআইএমআইএম-এর সভাপতি এবং হায়দ্রাবাদ থেকে সাংসদ আসাদুদ্দিন ওয়াইসি একটি জ্বলন্ত বক্তৃতা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, সংবিধানের প্রথম পৃষ্ঠাই চিন্তা, প্রকাশ, বিশ্বাস, ধর্ম এবং উপাসনার পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়, তাহলে কোনো নাগরিককে কোনো দেবতা বা দেবীর উপাসনা বা সিজদা করতে কীভাবে বাধ্য করা যায়? এই বক্তৃতা শুধু ‘বন্দে মাতরম’-এর ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপট নিয়ে নয়, বরং ভারতের সেক্যুলার চরিত্র এবং দেশপ্রেমের সত্যিকারের রূপ নিয়েও একটি গভীর আলোচনা উস্কে দিয়েছে।
আলোচনার প্রেক্ষাপট
‘বন্দে মাতরম’ গানটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাস থেকে উদ্ভূত, যা ১৮৮২ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। এটি স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি শক্তিশালী প্রতীক হলেও, এর কিছু অংশে হিন্দু দেবী-দেবতার উল্লেখ থাকায় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ১৯৫০ সালে এটিকে জাতীয় সংগীত ঘোষণা করা হয়, কিন্তু জাতীয় সঙ্গীতের মতো বাধ্যতামূলক করা হয়নি। আজ, ১৫০ বছর পূর্ণ হওয়ার উপলক্ষে লোকসভায় এই আলোচনা হলেও, ওয়াইসির মতে, সরকার এটিকে গোপন রাখার চেষ্টা করেছে—কারণ আলোচনায় মাত্র ৩০ জন সাংসদ উপস্থিত ছিলেন।
ওয়াইসি তাঁর বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জিন্নাহ-সম্পর্কিত মন্তব্যেরও সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “আমরা সবাই জিন্নাহ-বিরোধী, তাই ভারতকে আমাদের দেশ মনে করি। কিন্তু ১৯৪২ সালে আপনার প্রিয় ভীর এবং জিন্নাহর দল উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত, সিন্ধু ও বাংলায় যৌথভাবে শাসন করেছিল। এবং এই সরকার ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ১.৫ লক্ষ হিন্দু-মুসলিমকে যোগ দিয়েছিল যাতে তারা লড়াই করে।” তিনি কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, “লোককে প্রতারিত করে পারসা হয়ে যেও না, বলো তাদের যে মানুষ হও, ঈশ্বর নয়।”
সংবিধানের আলোকে বিতর্ক
ওয়াইসির বক্তৃতার মূল অংশ ছিল ভারতের সংবিধানের প্রস্তাবনা নিয়ে। তিনি উল্লেখ করেন, সংবিধান ‘মাতৃভারত’ দিয়ে শুরু হয় না, বরং এটি চিন্তা, প্রকাশ, বিশ্বাস, ধর্ম ও উপাসনার স্বাধীনতা দিয়ে শুরু। “যদি সংবিধানের প্রথম পৃষ্ঠাই এটি বলে, তাহলে কোনো নাগরিককে দেবতা বা দেবীর সামনে মাথা নত করতে বাধ্য করা যায় কীভাবে?” তিনি সংविधান সভায় রোহিণী কুমার চৌধুরী ও কে.বি. কামথের প্রস্তাবের উল্লেখ করেন, যা গৃহীত হয়নি। বাবাসাহেব আম্বেডকরের মতো, তিনি বলেন, ভারত ‘ভাইখুঁটে ভারত’—কোনো দেবতা বা ধর্মের সম্পত্তি নয়।
ওয়াইসি সুপ্রিম কোর্টের রায়েরও উল্লেখ করেন। ১৯৮৬-এর বিজু ইমানুয়েল মামলায় (জেহোভার উইটনেস) এবং ২০১৭-এর আশ্বিন উপাধ্যায়ের মামলায় কোর্ট বলেছে, জাতীয় সঙ্গীত শোনা বাধ্যতামূলক নয়। ১৯৭১-এর প্রতিরোধ অপমান আইনেও ‘বন্দে মাতরম’-কে জাতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে তুলনা করা হয়নি। তিনি জিজ্ঞাসা করেন, “যদি ‘বন্দে মাতরম’ জাতীয়তাবাদের মাপকাঠি হয়, তাহলে হযরত মোহানী, যুসুফ মেহরালি বা হায়দ্রাবাদের মৌলভি আলাউদ্দিনের জাতীয়তা কী ছিল? তারা তো ব্রিটিশের বিরুদ্ধে জিহাদের ফতোয়া দিয়েছিলেন!”
ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক সমালোচনা
ওয়াইসি ‘আনন্দমঠ’-এর নির্দিষ্ট পৃষ্ঠা (৭০, ৮০, ৯৮, ১১৫-১৬, ১২০) উল্লেখ করে বলেন, উপন্যাসে মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক বর্ণনা আছে—যেমন মুসলিম অঞ্চল পোড়ানো বা শাস্তি দেওয়া। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতামত উদ্ধৃত করেন: “সংসদ সকল ধর্মের মিলনস্থল, সেখানে এই গান উপযুক্ত নয়, কারণ বাঙালি মুসলিমরা এতে অসহ্য অনুভব করেন।” এমনকি সুভাষচন্দ্র বোসেরও এই গানের বিরোধিতা ছিল। শেষে, তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের বাচেলর পরীক্ষায় ফেল করার ঘটনা উল্লেখ করে ব্যঙ্গ করেন: “সাহিত্যের মহান ব্যক্তিত্ব বলছেন, যিনি ৭ নম্বরে ফেল করেছিলেন!”
দেশপ্রেমের সত্যিকারের রূপ
ওয়াইসি জোর দিয়ে বলেন, তাঁর ইসলামে তাওহীদ (এক ঈশ্বরবাদ) আছে, কুরআন বলে “আমারই উপাসনা করো”। নবী মুহাম্মদ (সা.) মদিনার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু দেশের ভালোবাসা ধর্মের উপর নির্ভর করে না। “দেশপ্রেম মানে নিপীড়ন, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, সহিংসতা শেষ করা। ভারত একটি বাগান, যেখানে প্রতিটি ফুল ফুটবে—একটি ফুলের জন্য পুরো বাগান মরুভূমি হয়ে যাবে না।”
তাঁর বক্তৃতা শেষ করে তিনি বলেন, “আমরা দেশপ্রেমের সার্টিফিকেট চাই না। সংবিধান যা বলে, তাই মেনে চলুন।” এই বক্তৃতা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে, যেখানে সমর্থকরা তাঁকে ‘সাহসী’ বলছেন, আনুমানিক ২০০ লাইক এবং ৭০ রিপোস্ট পেয়েছে।
ওয়াইসির এই বক্তৃতা ভারতের সেক্যুলারিজমের প্রতি একটি শক্তিশালী রক্ষণাবেক্ষণের কথা বলে। এটি শুধু একটি গানের বিতর্ক নয়, বরং সকল নাগরিকের সমান অধিকারের লড়াই। সরকারের প্রতিক্রিয়া কী হবে, তা দেখার বিষয়।



