ইন্টারনেটের বিশ্বে একটি বড় ধস নেমেছে। ক্লাউডফ্লেয়ার নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারনেট ইনফ্রাস্ট্রাকচার কোম্পানির আউটেজের কারণে হাজারো ওয়েবসাইট এবং অ্যাপ সেবা অ্যাক্সেসযোগ্যতা হারিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম X (পূর্বের টুইটার), OpenAI-এর ChatGPT, Spotify, Canva, Grindr, League of Legends এবং এমনকি ক্রিপ্টোকারেন্সি সাইট যেমন Arbiscan এবং DefiLlama। এই ঘটনা শুধু ব্যবহারকারীদের অসুবিধার সৃষ্টি করেনি, বরং ইন্টারনেটের ভঙ্গুরতা এবং কয়েকটি কোম্পানির উপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। এই নিউজ আর্টিকেলে আমরা জানব ক্লাউডফ্লেয়ার কী, কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ এবং কেন এর একটি আউটেজ হাজারো সাইটকে প্রভাবিত করে।
ক্লাউডফ্লেয়ার কী?
ক্লাউডফ্লেয়ার (Cloudflare) হলো একটি আমেরিকান টেকনোলজি কোম্পানি, যা ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি ইন্টারনেটের ‘ব্যাকবোন’ হিসেবে পরিচিত, যা বিশ্বের লক্ষ লক্ষ ওয়েবসাইট এবং অ্যাপের জন্য নিরাপত্তা, গতি এবং নির্ভরযোগ্যতা প্রদান করে। সহজ কথায় বললে, ক্লাউডফ্লেয়ার একটি ‘প্রক্সি’ সার্ভিস যা ব্যবহারকারী (যেমন আপনি) এবং ওয়েবসাইটের অরিজিনাল সার্ভারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে। এর মূল সার্ভিসগুলো হলো:
- সিকিউরিটি প্রটেকশন: DDoS (Distributed Denial of Service) অ্যাটাক থেকে সুরক্ষা, যা হ্যাকাররা ওয়েবসাইটকে ট্রাফিকের আধিক্যে ডাউন করার চেষ্টা করে। ক্লাউডফ্লেয়ার বট এবং ম্যালিসিয়াস ট্রাফিক ফিল্টার করে।
- কনটেন্ট ডেলিভারি নেটওয়ার্ক (CDN): ওয়েবসাইটের কনটেন্ট (ইমেজ, ভিডিও, টেক্সট) ক্যাশ করে রেখে দ্রুত লোডিং নিশ্চিত করে, বিশেষ করে দূরবর্তী লোকেশন থেকে অ্যাক্সেস করলে।
- অন্যান্য টুলস: DNS রেজোলভার, এজ কম্পিউটিং, WARP (ভিপিএন-লাইক সিকিউরিটি) এবং অ্যানালিটিক্স।
বিশ্বের প্রায় ২০% ওয়েবসাইট ক্লাউডফ্লেয়ারের সার্ভিস ব্যবহার করে, যার মধ্যে রয়েছে ফেসবুক, অ্যামাজন, নেটফ্লিক্স এবং ছোট বিজনেস থেকে শুরু করে বড় কর্পোরেশন। এটি বিশ্বব্যাপী ৩০০টিরও বেশি ডেটা সেন্টার নিয়ে কাজ করে, যা ইন্টারনেটকে দ্রুত এবং নিরাপদ করে তোলে।
আজকের আউটেজ: কী ঘটেছে?
২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর সকাল ১১:২০ ইউটিসি (লন্ডন সময় অনুযায়ী দুপুর ১২টা) থেকে ক্লাউডফ্লেয়ারের নেটওয়ার্কে অস্বাভাবিক ট্রাফিকের স্পাইক দেখা দেয়। এর ফলে বিস্তৃত ৫০০ এরর (ইন্টার্নাল সার্ভার এরর), ৫০২/৫০৪ ‘ব্যাড গেটওয়ে’ এরর এবং ড্যাশবোর্ড/এপিআই ফেলিয়র ঘটে। ব্যবহারকারীরা ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে গিয়ে “ক্লাউডফ্লেয়ারের নেটওয়ার্কে ইন্টার্নাল সার্ভার এরর” মেসেজ দেখেছেন এবং “কয়েক মিনিট পর আবার চেষ্টা করুন” বলা হয়েছে।
আউটেজের সময়কাল ছিল প্রায় ৩ ঘণ্টা। ডাউনডিটেক্টর (যা নিজেও প্রভাবিত হয়েছে) অনুসারে, X-এ ৯,৭০৬টিরও বেশি রিপোর্ট এসেছে, যখন ChatGPT, Spotify এবং Canva-তেও হাজারো কমপ্লেইন। অন্যান্য প্রভাবিত সাইট: Vinted, bet365, Perplexity, Letterboxd, Grindr এবং ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্ম যেমন Toncoin। এমনকি অ্যামাজন এবং ফেসবুকও আংশিকভাবে প্রভাবিত হয়েছে।
ক্লাউডফ্লেয়ারের স্ট্যাটাস পেজে বলা হয়েছে, “আমরা অস্বাভাবিক ট্রাফিকের কারণে এরর দেখছি। আমরা সমস্ত ট্রাফিক সার্ভ করার জন্য পুরো টিম নিয়ে কাজ করছি।” দুপুর ২:৪৮ ইউটিসি নাগাদ কোম্পানি ঘোষণা করে যে ফিক্স ইমপ্লিমেন্ট করা হয়েছে এবং ইনসিডেন্ট রিসলভড। তবে, কিছু কাস্টমার এখনও ড্যাশবোর্ড অ্যাক্সেসে সমস্যা ফেস করছে। এই আউটেজের পূর্বে ক্লাউডফ্লেয়ার সান্তিয়াগো ডেটা সেন্টারে শিডিউলড মেইনটেন্যান্সের কথা জানিয়েছিল, যা সম্ভবত ট্রিগার হয়েছে।
কেন আউটেজ হাজারো সাইটকে ডাউন করে?
ক্লাউডফ্লেয়ারের আউটেজ এত বড় স্কেলে প্রভাব ফেলে কারণ এটি ইন্টারনেটের একটি ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট অফ ফেলিয়র’ (একক ব্যর্থতার বিন্দু) হয়ে উঠেছে। কেন এমন হয়েছে?
- বিস্তৃত নির্ভরতা: লক্ষ লক্ষ সাইট ক্লাউডফ্লেয়ারের মাধ্যমে ট্রাফিক রুট করে। যখন ক্লাউডফ্লেয়ার ডাউন হয়, তখন সেই সব সাইটের ট্রাফিক ব্লক হয়ে যায়, যদিও তাদের নিজস্ব সার্ভার চালু থাকে।
- সিকিউরিটি এবং পারফরম্যান্সের প্রয়োজন: সাইবার অ্যাটাকের যুগে DDoS থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সবাই ক্লাউডফ্লেয়ারের উপর নির্ভর করে। এটি সুবিধাজনক, কিন্তু ফলে একটি সমস্যা হাজারো সাইটকে প্রভাবিত করে।
- গ্লোবাল নেটওয়ার্ক: ৩০০+ ডেটা সেন্টার থাকলেও, একটি গ্লোবাল ইস্যু (যেমন অস্বাভাবিক ট্রাফিক) সমস্ত নেটওয়ার্ককে প্রভাবিত করে। এটি AWS বা Microsoft Azure-এর মতো অন্যান্য ক্লাউড সার্ভিসের মতোই।
- পূর্বের ঘটনা: ২০২৩ সালের নভেম্বরে একটি নেটওয়ার্ক ইস্যুতে হাজারো সাইট ডাউন হয়েছিল, এবং গত মাসে AWS আউটেজে Snapchat, Reddit ইত্যাদি প্রভাবিত হয়েছে। এগুলো দেখায় যে ইন্টারনেট কতটা কেন্দ্রীভূত হয়ে গেছে।
ক্লাউডফ্লেয়ারের CEO ম্যাথিউ প্রিন্স বলেছেন, “আজ আমরা আমাদের কাস্টমার এবং ইন্টারনেটকে ব্যর্থ হয়েছি। আমরা কারণ খুঁজে বের করব।” এই ঘটনা ইন্টারনেটের ভবিষ্যতে বৈচিত্র্যময় ইনফ্রাস্ট্রাকচারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
প্রভাব এবং পাঠ
এই আউটেজে লক্ষ লক্ষ ব্যবহারকারী প্রভাবিত হয়েছে—সোশ্যাল মিডিয়া থেকে গেমিং, ডেটিং অ্যাপ থেকে ক্রিপ্টো ট্রেডিং পর্যন্ত সবকিছু থমকে গেছে। শেয়ার মার্কেটে ক্লাউডফ্লেয়ারের স্টক ৫% নেমেছে। তবে, ভালো খবর হলো সার্ভিসগুলো এখন স্বাভাবিক হয়ে আসছে।
ইন্টারনেটের এই ‘হিডেন জায়ান্ট’গুলোর উপর নির্ভরতা কমানোর জন্য বিজনেসগুলোকে বিকল্প রুট ব্যবহার করতে হবে। আপনার সাইট যদি ক্লাউডফ্লেয়ার-নির্ভর হয়, তাহলে ব্যাকআপ প্ল্যান রাখুন। আরও আপডেটের জন্য ক্লাউডফ্লেয়ারের স্ট্যাটাস পেজ চেক করুন।


