ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ ইজরায়েল সফর শুরু হচ্ছে। এই সফরকে কেন্দ্র করে আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মোদির নেতৃত্বে ভারত ইজরায়েলের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্কের দেয়াল ভেঙে ফেলতে সক্ষম হয়েছে, যদিও এর মূল্য দিতে হয়েছে ফিলিস্তিনকে। ২০১৭ সালে প্রথম কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইজরায়েল সফর করে মোদি কূটনৈতিক নিয়ম ভেঙে ফিলিস্তিন না গিয়েই কেবল ইজরায়েল সফর করেছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্পর্ক এখন শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে গাজায় ইজরায়েলের সামরিক অভিযানের মধ্যেও প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বেড়েছে এবং ভারত ইজরায়েলকে আন্তর্জাতিকভাবে নিঃসঙ্গ অবস্থায় সমর্থন দিচ্ছে।
মোদি-নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব ও মতাদর্শগত মিল
প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, মোদি এবং ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যকার ব্যক্তিগত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারে বড় ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে, হিন্দুত্ববাদী আদর্শে বিশ্বাসী মোদি সরকার এবং ইজরায়েলের নিজস্ব জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে একটি মতাদর্শগত সাযুজ্য রয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। তারা উভয়েই ‘ইসলামি সন্ত্রাসবাদ’কে প্রধান হুমকি হিসেবে দেখে এবং প্রতিরক্ষা খাতে ভারত এখন ইজরায়েলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ক্রেতা। ২০২৪ সালে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরেও ভারতীয় অস্ত্র সংস্থাগুলি ইজরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখে বলে আল জাজিরার একটি তদন্তে উঠে আসে।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে ভারতের অবস্থানের পরিবর্তন
১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের ফিলিস্তিন বিভক্তিকরণ পরিকল্পনার বিরোধিতা করা এবং ১৯৮৮ সালে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া ভারত এখন তার ঐতিহাসিক অবস্থান থেকে অনেকটাই সরে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ বা ‘বাস্তববাদী’ পররাষ্ট্রনীতির নামে ভারত এখন ফিলিস্তিন ইস্যুতে আগের চেয়ে অনেক বেশি নীরব। গাজায় চলমান যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা সত্ত্বেও মোদির ইজরায়েল সফর এবং সেখানে নেসেটে (ইজরায়েলের পার্লামেন্ট) ভাষণ দেওয়া ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রকাশ্যে ইজরায়েলপন্থী নীতির উদাহরণ। বিশেষজ্ঞ অশ্বার আলমের মতে, এই নীতি পরিবর্তনের ফলে গ্লোবাল সাউথে ভারতের নৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়েছে এবং এটি ইজরায়েলের ফিলিস্তিন নীতিকে পরোক্ষভাবে সমর্থন করার মতো।
মধ্যপ্রাচ্যের বদলে যাওয়া চিত্র ও ভারতের ভবিষ্যৎ কৌশল
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে ইরানের ওপর সম্ভাব্য হামলা এবং ইজরায়েলের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক প্রভাব—এই সম্ভাবনাগুলো সামনে রেখেই ভারত তার কৌশল সাজাচ্ছে। ভারত ইতিমধ্যেই ইরান থেকে তেল আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে এবং চাবাহার বন্দর প্রকল্পে কাজ কমিয়ে দিয়েছে। ক্রাইসিস গ্রুপের বিশেষজ্ঞ ম্যাক্স রডেনবেকের মতে, ভারত সম্ভবত ইজরায়েল-পন্থী এই অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ওয়াশিংটনে নিজের প্রভাব বাড়াতে চায়। যদিও ভারত এখনও দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানে সমর্থনের কথা বলে, বর্তমান বাস্তবে তার নীতি স্পষ্টতই ইজরায়েলকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে, যা ফিলিস্তিনি স্বার্থের জন্য ব্যয়বহুল হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।