যদি হরমুজ প্রণালী স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে ভারতের জন্য তা হবে একটি বড় অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নিরাপত্তার সংকট। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেলের চোকপয়েন্ট হিসেবে পরিচিত এই প্রণালী বন্ধ হলে ভারতের অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী?
হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় ২১ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল (বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় ২০-২৫%) যায়। সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েতসহ পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল মূলত এই পথেই আসে।ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ। তার মধ্যে প্রায় ৬০-৬৫% তেল আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত প্রায় ২২৫ মিলিয়ন টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে, যার মধ্যে বড় অংশই হরমুজ প্রণালী হয়ে আসে।
ভারতের উপর সম্ভাব্য প্রভাব:
১. তেলের দামে আকাশছোঁয়া বৃদ্ধি: স্থায়ী বন্ধের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১৫০-২০০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দেশে পেট্রোল-ডিজেলের দামও লাফিয়ে বাড়বে।২. মূল্যস্ফীতির চাপ: জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, সার, প্লাস্টিক, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ প্রায় সব ক্ষেত্রে খরচ বেড়ে যাবে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাবে।৩. বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি: ভারতের বাণিজ্য ঘাটতির একটি বড় অংশ জ্বালানি আমদানির কারণে। হরমুজ বন্ধ হলে এই ঘাটতি আরও প্রকট আকার ধারণ করবে।৪. শিল্প ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ধাক্কা: রাসায়নিক, সিমেন্ট, টেক্সটাইল, পরিবহন খাতসহ বিভিন্ন শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে। GDP প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।
ভারত কতটা প্রস্তুত?
- বিকল্প উৎস: ভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বাড়িয়েছে। ২০২৫ সালে রাশিয়া ভারতের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহকারী দেশে পরিণত হয়েছে। তবে রাশিয়ান তেলও পুরোপুরি হরমুজের বিকল্প হতে পারবে না।
- স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ: ভারতের কাছে বর্তমানে প্রায় ৭৫ দিনের তেল মজুত রয়েছে। কিন্তু স্থায়ী বন্ধের ক্ষেত্রে তা যথেষ্ট নয়।
- ডাইভার্সিফিকেশন: সরকার ইতোমধ্যে লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল আমদানি বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. অনির্বাণ গাঙ্গুলি বলেন,
“হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে ভারতের জন্য এটি হবে ‘ব্ল্যাক সোয়ান’ ইভেন্টের মতো। স্বল্পমেয়াদে আমাদের কোনো পূর্ণাঙ্গ বিকল্প নেই। দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোই একমাত্র সমাধান।”
উপসংহার
হরমুজ প্রণালী স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম, তবে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা (বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক) বাড়লে এই ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ভারতকে এখনই জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে আরও বেশি করে কাজ করতে হবে।

Leave a Comment